আজ বুধবার দুপুর ১২ টায় ২৪/৭/১৯ খ্রিঃ পুলিশ অফিস কনফারেন্স রুমে সম্প্রতি সারাদেশে ছেলেধরা/গলাকাটা গুজব সংক্রান্তে ময়মনসিংহ জেলায় সংঘটিত অনভিপ্রেত ঘটনা বলীর বিবরণ ও জেলা পুলিশের তৎপরতার বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মত বিনিময় করেন জনাব মোঃ হুমায়ুন কবির পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত), ময়মনসিংহ।এ সময় ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের অন্যান্য কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন । সম্প্রতি সারাদেশে ছেলেধরা গুজব সংক্রান্তে ময়মনসিংহ জেলায় সংঘটিত অনভিপ্রেত ঘটনাবলীর বিবরণ ও জেলা পুলিশের তৎপরতা।
(১) গত ২১/০৭/১৯ তারিখ রাত অনুমান ০১.৩০ ঘটিকার সময় অত্র জেলার কোতোয়ালী থানাধীন উজান ঘাগড়া সাকিনে জনৈক জসিম(৪০), পিতা-বাবুল, সাং-উজান ঘাগড়া, থানা-কোতোয়ালী, জেলা-ময়মনসিংহ এর দু’চালা বসত ঘরের দরজার পাশের টিন খুলে জনৈক রাকিব(১৯), পিতা-রুবেল, সাং-আকুয়া চৌরঙ্গীর মোড়, থানা-কোতোয়ালী, জেলা-ময়মনসিংহ জসিম এর অনুপস্থিতিতে তার ঘরে প্রবেশ করলে জসিম এর স্ত্রী শাহিদা চিৎকার করিলে সন্দিগ্ধ রাকিব ঘরের ভিতরে ঘুমিয়ে থাকা বাচ্চাদের খাটে বসে পড়লে জসিম এর স্ত্রী শাহিদা হৈ-হুল্লোড় ও চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করলে আশপাশের লোকজন দৌড়ে এসে সন্দিগ্ধ রাকিবকে ছেলেধরা সন্দেহে গনপিটুনী দেয় এবং উত্তেজিত জনতার মধ্যে সন্দিগ্ধ রাকিবকে চাকু দিয়ে পেটের ডান পাশে আঘাত করে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করে এবং অন্য একজন চাকু দিয়ে রাকিব এর ডান হাতে আঘাত করে। সংবাদ পেয়ে পুলিশ দ্রত ঘটনা স্থলে পৌছে রাকিবকে হেফাজতে নিয়ে তার চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করে। প্রাথমিক ভাবে জানা যায় রাকিব একজন মাদকসেবী ও অভ্যাসগত সিধেদ চোর। এ সংক্রান্তে তাকে হেফাজত পূর্বক কোতোয়ালী মডেল থানার মামলা নং-৯৫, তারিখ-২৩/০৭/১৯খ্রিঃ ধারা-৪৫৭/৩৮০/৫১১ দঃবিঃ রুজু করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে কোতোয়ালী মডেল থানার মামলা নং-১৯, তারিখ-০৬/১১/২০১৮ ইং, ধারা-৪৫৭/৩৮০ দঃবিঃবিচারাধীন আছে।
(২) গত ২১/০৭/২০১৯ তারিখ ভালুকা মডেল থানাধীন আমতলী গ্রামে শেখ ফরিদ (৩০) ও মঞ্জুরুল খান (২৪) দ্বয় মঞ্জুরুল এর বোনের বাড়ীতে বেড়াতে আসলে অনুমান ০২.৪০ ঘটিকার সময় মঞ্জুরুল এর বোনের বাসার সামনে রাস্তায় দাড়িয়ে তারা দুইজন কথা বলতে থাকা অবস্থায় উক্ত এলাকার সুজন (১৮) ও হৃদয় (১৯) তাদের নাম ঠিকানা জানতে চায়। কোথায় আসছে জানতে চাইলে মঞ্জুরুল বলে তার বোনের বাসায় বেড়াতে আসছে। সুজন ও হৃদয় তাদের কথা বিশ্বস না করলে তারা তাদের বোনের বাসার ভিতরে নিয়ে গেলে অন্যান্য ভাড়াটিয়ারা বলে যে, তারা এ বাসায় বেড়াতে আসছে। তারপরেও সুজন ও হৃদয় ওদের দুজনকে রাস্তায় নিয়ে আসে এবং তাদের কাছে ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। এলাকার বড় ভাইয়ের কথা বলে আরো কয়েক জনকে ফোন করে নিয়ে আসে এবং তাদেরকে ছেলেধরা অপবাদ দিয়ে মারপিট শুরু করে। তাদের কাছ থেকে ছেলেধরা স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য সবাই মারপিট করতে থাকে। সংবাদ পেয়ে তাৎক্ষনিকভাবে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ভিকটিমদের উদ্ধার করে এবং ঘটনায় জড়িত ১। জয়নাল (৪৫), ২। সোহাগ (২৪), ৩। সুমন (২৪) দের আটক করে। এ সংক্রান্তে ভালুকা মডেল থানার মামলা নং-৪০, তারিখ-২২/০৭/২০১৯ ইং, ধারা-১৪৩/৩২৩/৩০৭/৩৭৯/৩৮৫ দঃ বিঃ রুজু করা হয়। ঘটনায় জড়িত অন্যান্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।
(৩) গত ২০.০৭.২০১৯ তারিখ ১০.২৫ ঘটিকার সময় সংবাদ পেয়ে ভালুকা থানা পুলিশ ভালুকা থানাধীন ধামশুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠের উপস্থিত হয়ে ২০০/২৫০ জননারী/পুরুষ এর সমাগম দেখে উক্ত স্থানে গিয়ে ঈদের নামাজ আদায়ের মিম্বারের খুটিতে হাতবাধা একজন ৩৫ (পয়ত্রিশ) বছরের মহিলাকে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে মহিলার হাতের বাধন খুলে জ্ঞান ফিরানোর চেষ্টা করে। কিন্তু মহিলার জ্ঞান ফিরে না আসায় তাৎক্ষনিক ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরবর্তীতে মহিলার সাথে কথা বলে জানা যায় যে, তার নাম মোছাঃ মালেকা খাতুন (৩৫), স্বামী-মোঃশাহ আলম, সাং-পাঁচগাও, থানা-ভালুকা, জেলা-ময়মনসিংহ। সে ভালুকা থানাধীন মামারিশপুর সাকিনস্থ রানার কোম্পানীতে কাজ করেন। সে হঠাৎ শারীরিক ভাবে অসুস্থ্য (জর) হওয়ায় তার কর্মস্থল হতে ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসার পথে ধামশুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে আসলে তার শরীর খারাপ লাগায় সেখানে বসলে উপস্থিত লোকজন বিভিন্ন প্রশ্ন করলে তার আঞ্চলিক ভাষার মিল না থাকায় এ ঘটনা ঘটে। উল্লেখ্য তার বাবার বাড়ী ভোলা জেলায় এবং শশুর বাড়ী ভালুকা থানাধীন মামারিশপুর সাকিনে। মহিলার আচরনে পাগলামী ভাব আছে বলে তার স্বামীর নিকট হতে জানা যায়। বিষয়টি ভালুকা মডেল থানার সাধারন ডাইরী নং-৮০৭, তাং-২০.০৭.২০১৯ খ্রিঃ মূলে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে ও মামলা নং-৪৩, তারিখ-২৩.০৭.২০১৯ খ্রিঃ, ধারা-১৪৩/৩২৩/৩২৫/৩০৭/৩৭৯ দঃ বিঃ রুজু করা হয়েছে। আসামী গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।
(৪) গত ২০.০৭.২০১৯ তারিখ অনুমান ১২:০০ ঘটিকার সময় সাবিনা (৩০), স্বামী-রাশিদ, সাং-জীবনতলা, থানা-ভালুকা, জেলা-ময়মনসিংহ তার বাবার বাড়ীর পিছনে তার ৮ মাসের ছেলে শাওনকে নিয়ে দাড়িয়ে গলাকাটা বলে চিৎকার দেয় এবং সাবিনা তার ছেলেকে নিয়ে ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার তার বাচ্চার কোন কিছু হয়নি বলে চিকিৎসা লাগবে না বলে জানায়। সংবাদ পেয়ে ভালুকা মডেল থানা পুলিশ দ্রত ঘটনাস্থলে পৌছৈ গলাকাটা সংবাদের বিষয়ে তদন্তকালে জানা যায় যে, উক্ত সাবিনা হাটের রোগী এবং মানসিক সমস্যা থাকার কারণে সে মাঝেমাঝে পাগলামি করে। ঘটনাস্থলের পাশে গরুর ঘাস কাটতে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীদের কথামত মহিলা উদ্দেশ্য মূলক ভাবে হঠাৎ গলাকাটা বলে চিৎকার দেয়। অসাবধানতা বশতঃ তার ছেলের গলায় রুপার একটি চেইন থাকায় সে চেইনে হাতে টান লাগলে গলায় একটু দাগ হয় বলে ধারনা করা হচ্ছে। স্বামীর ভয়ে সাবিনা আক্তার এরূপ গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিষয়টি ভালুকা মডেল থানার সাধারন ডাইরী নং-৮০৫, তাং-২০.০৭.২০১৯ খ্রিঃ মূলে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
ছেলে ধরা সংক্রান্ত ঘটনা রোধ ও জনমনে গুজব বা ভ্রান্ত ধারণা রোধকল্পে জেলা পুলিশ বর্ণিত কার্যাবলী যথাযথভাবে পালন করছে।
ক) প্রতিটি কেস/ঘটনা পুলিশ সুপার/উর্দ্বতন পুলিশ অফিসারের মাধ্যমে তদারকি করে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করার লক্ষ্যে সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
খ) আওতাধীন এলাকায় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, গ্রাম-গঞ্জের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণস্থানে এন্টিক্রাইম মিটিং, মাইকিং ও লিফলেট বিলি করে উল্লেখিত গুজবের বিষয়ে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করছে। এ ক্ষেত্রে কমিউনিটি পুলিশিং, মসজিদ ও মন্দির ভিত্তিক কমিটি, যানবাহন শ্রমিক কমিটি, হাট-বাজার সংক্রান্ত কমিটির মাধ্যমে গণসচেতনতার কার্যক্রম গ্রহণ করা। শুক্রবারে জুম্মার নামাজে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করা হচ্ছে।
গ) প্রয়োজনে ৯৯৯ তে ঘটনার বিষয়ে তাৎক্ষনিক খবর জানানোর জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
ঘ) সন্দেহ জনক এ ধরনের কোন ঘটনার উদ্রেগ হলে জেলার সকল উর্দ্বতন কর্মকর্তার নম্বরে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।
ঙ) এলাকার গণ্যমান্য এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে সম্পৃক্ত করে ছেলেধরা সংক্রান্ত প্রকৃত ঘটনা উল্লেখ পূর্বক জনমনে একটি স্বচ্ছ ধারনা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
চ) ঘটনার ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
www.dailyamaderbani.com দেশ ও জনগণের কথা বলে