স্টাফ রিপোর্টারঃ
গত ২১ জুন-২০ইং ইত্তেফাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব বাংলাদেশ বিমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান জনাব সাজ্জাদুল হাসান এর স্ত্রী বেগম লায়লা আরজুমানের তাঁর বাবার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি লেখা প্রকাশিত হওয়ায়,ময়মনসিংহ মহানগর প্রেসক্লাব ও ডেইলি আমাদের বাণী.কম পরিবারের পক্ষ থেকে ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ তোফায়েল উদ্দিন সৈয়দ তপনের অভিনন্দন।
লেখাটি হলো-
বাবা তোমাকে সব সময় খুব মনে পড়ে। সেই ছোট বেলায় গভীর মমতায় হাত ধরে স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলে, বুঝিয়েছিলে,জ্ঞানই আলো। শিখিয়েছিলে, শততাই আনন্দ। চলার পথে কোনো পিতাকে যখন দেখি, সন্তানকে হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যায়, তখন তোমার কথা মনে পড়ে যায়। কোনো কিছু লেখতে বসলে তোমার কথা অস্থির চিত্তে মনে পড়ে। মনে হয়, এই বুঝি এসে, স্বভাবসুলভ হেসে, ছোটো বেলার মতো আমার লেখাগুলো দেখে দেবে, কথা গুলো গুছিয়ে দেবে। সন্ধার পর তোমার কাছে পড়তে বসতাম। তুমি সমস্ত পড়া বুঝিয়ে দিতে।
এখন সন্ধার পর নিজের ছেলেকে যখন পড়া দেখিয়ে দিই,তখন তোমার কথা ভিষণ মনে পড়ে যায়। সেই চশমা পড়া মুখখানি মনের গহিনে বারবার ভেসে ওঠে। এসএসসিতে যখন ভালো রেজাল্ট করালাম, খুব খুশি হয়েছিলে।সেই দিনের তোমার আনন্দ ভরা মুখচ্ছবি মনে পড়ে। সেদিন অফিস ছুটির পর অনেক গুলো মিষ্টির প্যাকেট একসঙ্গে হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নামলে। তোমার কষ্ট হচ্ছে মনে করে কে যেন ছুটে গিয়ে তোমার হাত থেকে মিষ্টির প্যাকেট নিতে গেল। তখন তুমি বললে, ভালো রেজাল্টের মিষ্টি এইগুলা, এই প্যাকেটের যত ওজন, তত আনন্দ। কোনো পিতাকে যখন দেখি, সন্তানের রেজাল্টের আনন্দে মিষ্টির দোকানে ছুটে যায়, তখন বাবা তোমার কথা খুব মনে পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে সার্টিফিকেট যখন তোমার হাতে দিলাম, তখন ভীষণ খুশি হয়ে ছিলে।বলে ছিলে মা,এ তোর অর্জন।বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা ছেলেমেয়েদের যখন আনন্দ দেখি,তখন তোমার কথা মনে পড়ে যায়। অলস দুপুরে হঠাৎ নতুন একটা বই হাতে দিয়ে বলতে, মা,বইটা পড়ে দেখ,অনেক ভালো লাগবে। বই পড়তে পড়তে যখন সন্ধা হয়ে যেত,টেরই পেতাম না।যখনই নতুন বই পড়তে যাই,তখনই তোমার কথা বারবার মনে পড়ে।নিজের অজান্তেই বাবার পদধ্বনি শোনার অপেক্ষায় থাকি।পরক্ষণে নিজের ভিতরে প্রতিধ্বনি হতে থাকে, তুমি কোথাও নেই,কোথাও নেই। পূর্ণিমা,অমাবস্যা, শুকতারা, দ্রুবতারার সম্পর্কে তুমি বুঝিয়েছিলে।এখন পূর্ণিমা,অমাবস্যা, শুকতারা, দ্রুবতারা -সবই দেখি। শুধু তোমাকে দেখিনা।
সেই ছোট বেলায় সমুদ্র দেখতে নিয়ে গিয়েছিলে।সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে দেখি, বিশাল সমুদ্র। অনবরত জল তরঙ্গে চারদিক স্নিগ্ধতায় ঢেকে আছে। দূরে নীল আকাশ।সমুদ্রের বিশালতায় আমি মুগ্ধ।বাবাকে বিস্ময়ভাবে বললাম, সমুদ্র কি বিশাল! বাবা উত্তর দিয়ে ছিল, না বিশাল সমুদ্র পারি দিয়ে মানুষ অনেক দূরে যায়। যখনই সমুদ্রের কাছাকাছি যাই,তখনই বাবার কথা মনে পড়ে। আমি ছোট বেলায় থেকেই ঝড় প্রচন্ড ভয় পাই।বজ্রপাত হলে তো উপায়ই নেই। একছুটে তোমার কাছে চলে যেতাম। তুমি মজার গল্প বলে ভূলিয়ে রাখতে। যত দূরেই থেকেছি,ঝড় হলেই আমাকে ফোন করে বলতে কিরে মা ভয় পাচ্ছিস,ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ঝড় থেমে যাবে।
আসলে বাবা ঝড়ের দিনে তোমার কথা অনেক মনে পড়ে।বাতাসের প্রবল বেগের মাঝেও আমি যেন তোমার শব্দহীন কন্ঠ শুনতে পাই। মনে হয় তুমি যেন বলছ, কীরে মা ভয় পাচ্ছিস, ভয়ের কিছু নেই।ভয় পাওয়ার কিছু নেই।ঝড় থেমে যাবে।আসলে বাবা আমি ভূলেই যাই, তুমি চিরতরে হারিয়ে গেছো।চলে গেছো অজানা পৃথিবীতে। চাঁদরাতে তোমার ফোন আসতেই বলতে মা, ঈদ মোবারক। চাঁদ রাত আসে। ফোন আসেনা। আমার জন্মদিনে সকালে ফোন করে বলতে, মা শুভ জন্মদিন। আল্লাহ অনেক ভালো রাখুক, এই দোয়া করি। সেই ফোনটা আর আসেনা। তখন তোমাকে খুব খুব মনে পড়ে।
★লেখক,গবেষক
www.dailyamaderbani.com দেশ ও জনগণের কথা বলে